যারা ভূ-রাজনীতি এবং দিল্লির সাউথ ব্লকের ‘কৌশলগত গভীরতা’ (Strategic Depth) সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা রাখেন, তারা জানেন— ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদীর মাথায় ছোড়া এই গুলি কোনো সাধারণ সন্ত্রাসীর বন্দুক থেকে বের হয়নি। এই গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি, কারণ এর লক্ষ্য কেবল একজন ব্যক্তি শরীফ ওসমান হাদি নন; এর লক্ষ্য বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা এবং আধিপত্যবাদ বিরোধী প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর।
ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার বা ইনকিলাব মঞ্চ প্রতিষ্ঠার পর থেকে যা করছে, তা মূলত বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড় করানোর লড়াই। আর ইতিহাস সাক্ষী, আগ্রাসনকারীরা ভুখণ্ড দখলের আগে মস্তিষ্ক দখল করে, আর মস্তিষ্ক দখলের প্রধান হাতিয়ার হলো ‘সংস্কৃতি’।
ইতালীয় মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামসি তাঁর ‘প্রিজন নোটবুকস’-এ ‘কালচারাল হেজিমনি’ বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের যে ধারণা দিয়েছিলেন, তা বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দিল্লির নীতির সাথে হুবহু মিলে যায়। ভারত জানে, কাঁটাতারে ফেলানীকে ঝুলিয়ে বা তিস্তার পানি আটকে বাংলাদেশকে পুরোপুরি বশ করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন ‘সফট পাওয়ার’।
দিল্লির এই প্রজেক্টের প্রধান বাধা কারা? যারা হিন্দি গান, বলিউড সিনেমা আর আকাশ সংস্কৃতির জোয়ারে গা না ভাসিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব মুসলিম-বাঙালি স্বাতন্ত্র্যবোধের কথা বলে। শরীফ ওসমান হাদি এবং তার প্রতিষ্ঠান ঠিক এই জায়গাতেই আঘাত করেছিল। তারা যখন ভারতীয় অপসংস্কৃতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে সুস্থ সংস্কৃতির কথা বলে, তখন তারা কার্যত দিল্লির ‘অখণ্ড ভারত’ বা সাংস্কৃতিক অখণ্ডতার স্বপ্নে ব্যাঘাত ঘটায়।
ঐতিহাসিক আবুল মনসুর আহমদ তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’-এ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন পরবর্তী সময়েই সতর্ক করেছিলেন যে, কলকাতার কালচারাল আধিপত্য থেকে বের হতে না পারলে আমাদের স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আজ ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, সেই শঙ্কা কতটা সত্য। আমাদের ড্রয়িংরুম থেকে সিনেমা হল—সর্বত্রই আজ প্রতিবেশী দেশটির একচেটিয়া দখল। আর যখনই কেউ এর বিরুদ্ধে ‘ইনকিলাব’ বা বিপ্লবের ডাক দেয়, তখনই তার বুকে গুলি চলে।
শরীফ ওসমান হাদীর ওপর এই হামলা আমাদের আবরার ফাহাদের কথা মনে করিয়ে দেয়। আবরারকে হত্যা করা হয়েছিল কারণ সে ভারতের সাথে অসম পানি চুক্তির বিরুদ্ধে কলম ধরেছিল। আর আজ হাদিকে গুলি করা হলো কারণ সে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মঞ্চ গড়েছিল। প্যাটার্নটি লক্ষ্য করুন—বিষয়টি পানি হোক বা সংস্কৃতি, যারাই ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তাদেরই ‘সরিয়ে দেওয়া’ বা ‘চুপ করিয়ে দেওয়া’ হয়।
বিগত কয়েক দশকে আমরা দেখেছি, তথাকথিত ‘সেক্যুলার’ এবং ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর মোড়কে কীভাবে একটি নতজানু বুদ্ধিজীবী শ্রেণী তৈরি করা হয়েছে। বদরুদ্দীন উমর তাঁর বিভিন্ন লেখায় বারবার উল্লেখ করেছেন কীভাবে আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে সাংস্কৃতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। এই পঙ্গুত্বের বিপরীতে ইনকিলাব মঞ্চ যখন একটি বিকল্প ন্যারেটিভ দাঁড় করাচ্ছে, তখন তা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার টার্গেট?
ভারত খুব ভালো করে জানে, রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু একটি জাতির সাংস্কৃতিক বোধ পরিবর্তন করতে পারলে সেই জাতিকে আর কখনো যুদ্ধে হারাতে হয় না। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার বাংলাদেশে সেই ‘কাউন্টার কালচার’ বা পাল্টা সংস্কৃতি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিল ।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং তাদের এদেশীয় দোসররা জানে, তরুণেরা যদি একবার বুঝতে শেখে যে ‘সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান’-এর নামে যা চলছে তা মূলত ‘সাংস্কৃতিক ডাম্পিং’, তবে তাদের বাণিজ্যের এবং প্রভাবের বাজার ধসে পড়বে। শরীফ ওসমান হাদি সেই সত্যটিই উচ্চস্বরে বলছিলেন।
শরীফ ওসমান হাদীর ওপর চালানো এই গুলি কেবল তার শরীরে বিদ্ধ হয়নি, এটি বিদ্ধ হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের কলিজায়।
আজকের এই রক্তপাত প্রমাণ করে, আধিপত্যবাদীরা তাদের পথের কাঁটা সরাতে কতটা মরিয়া। কিন্তু তারা ভুলে যায়, রক্ত কখনো কথা বলা থামায় না, বরং রক্তের দাগ প্রতিটি অন্যায়ের সাক্ষী হয়ে থাকে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য যে সাংস্কৃতিক রাজনীতি শুরু হয়েছিল, ১৯৪৭-এ যা দ্বিজাতিতত্ত্বে রূপ নিয়েছিল এবং ১৯৭১-এ যা স্বাধীন ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছিল—সেই ভূখণ্ডের মানুষ জানে কীভাবে আগ্রাসনের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হয়।
আজকে যে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ বা শরীফ ওসমান হাদিরা আক্রান্ত হচ্ছেন, তা প্রমাণ করে ২০২৪-এর লড়াই এখনো শেষ হয়নি। এটি কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি ‘সাংস্কৃতিক কিবলা’ ঠিক করার লড়াই। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ১৯০৫ থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রারই অংশ—যেখানে এই অঞ্চলের মানুষ নিজেরা নিজেদের মতো করে, নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
লেখকঃ আল আমিন রিফাত
লেখকঃ আল আমিন রিফাত
কেন্দ্রীয় সদস্য, আপ বাংলাদেশ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন